অমর পালের গান ও স্মৃতির তরণী

0

(ক)
সত্যজিৎ রায়ের ‘হীরক রাজার দেশে’ ছবির ‘কতই রঙ্গ দেখি দুনিয়ায়’ গানের দৌলতে অমর পালের কণ্ঠ এ দেশের অনেককেই আপ্লুত করেছিল। যদিও এর আগেই তার রেকর্ড হওয়া গানের সংখ্যা ছিল অনেক। তখনো ওভাবে নাম ছড়িয়ে পড়েনি। দেশ ভাগের কিছু আগে ২৬ বছর বয়সে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পাট চুকিয়ে তিনি পাড়ি জমান কলকাতায়। দেশত্যাগ যে তিনি আনন্দচিত্তে করেছিলেন, ব্যপারটা তা নয়। বহু তিক্ত অভিজ্ঞতার সঙ্গে এ দেশের অসংখ্য শাখার লোক গান বুকে নিয়ে যান তিনি।

কণ্ঠের যাদুতে বাংলার লোকজীবন সমাজ, প্রকৃতি ও মানব সম্মিলন, সংস্কৃতির সমন্বয় সুরবদ্ধ করে রেখেছেন গায়ক অমর পাল। আমাদের কৈশোরেই অমর পাল প্রবলভাবে প্রভাবিত করেছিলেন তার সরল গায়কী দিয়ে। তিনি চর্চা শুরু করেছিলেন ভাটিয়ালী গানের ধারা নিয়ে, পরে এল প্রভাতী, তারপর তো লোক গানের সকল ধারাতেই পরিব্রাজকের মতো ভ্রমণ করেছেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের প্রভাতীর সুর-বৈচিত্র্য ও প্রাণ নিজের কণ্ঠে পৌঁছে দিয়েছেন সবার কানে। ভাটিয়ালী, প্রভাতী, ভাওয়াইয়া, দেহতত্ত্ব, মুর্শীদি, চট্কা, পালা এসব লোক সুর ধারার সমন্বয়ে প্রকাশ করা তার একটা ক্যাসেট আমাদের শহরে (ব্রাহ্মণবাড়িয়া) আসে বেশ আগে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার গল্পকার ও বর্ণমালা প্রেসের মালিক মুহম্মদ সিরাজ সেটা আনিয়েছিলেন আগরতলা থেকে।

১৯৮৫ সালে অন্নদা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের শতবর্ষ উদযাপন অনুষ্ঠানে অমর পাল এসেছিলেন গান গাইতে। কয়েক হাজার মানুষ সেদিন তার গান শুনেছিলেন। তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অনেক হারিয়ে যাওয়া গান শুনিয়েছিলেন সেদিন। সেইসব গান ও গানের ভেতরের নাটকীয় মুহুর্তগুলোর কথা আজো মানুষ ভুলেনি। ‘গুম্মরিয়া মারে কিল দুম্মুরিয়া উঠে’, গানের এমন কথার তোড়ে প্রায় হাজার দশেক মন্ত্রমুগ্ধ শ্রোতা হাসির ঢেউয়ে গড়িয়ে পড়তে থাকেন। করুণ সুর আবার তাদের শান্ত করে দেয়। কণ্ঠের মোহনীয় জাদু আর সহনীয় ভাষার সব নিত্য পরিচিত ভাটিয়ালী-সারি গানের লহরীতে শ্রোতা দর্শকরা তন্ময় হয়েছিল সেদিন। মনে হতো তার গলার সুরের ভাজ খেলানো ঢেউ বুকে এসে আঘাত হানে।

‘শয়নে গৌর স্বপনে গৌর’ এই ভোর কীর্তন তখন আমাদের সারা দিনের সাথি। ওই ভোর কীর্তন ছাড়াও ‘আমি স্বপ্ন দেখি মধুমালার মুখ’, ‘মনা কি করলি রে’, ‘চিকন গোয়ালীনি’ -এসব গান ছিল নিত্য দিনের সাথি। বিষয়ভিত্তিক আয়োজন করতে গেলেই দেখি লোকগানের সব শাখাতেই অমর পালের বিচরণ। এফ.এম. রেডিওতে লোকগানের আয়োজন করতে এসে তার উপযোগিতা হাড়ে হাড়ে টের পাই। ‘হাওয়া বদল’ অনুষ্ঠানের (এবিসি রেডিও) সব আয়োজনেই অমর পালের কোনো না কোন গান এসে যায়। এবিসি রেডিও-র আনুষ্ঠান প্রযোজক ও আর জে শারমীন আহেমদও অমর পালের একজন ভক্ত। বছর তিনেক আগে আমি এবিসি রেডিও এফ এম ৮৯.২ হতে একটা সাক্ষাৎকার নেয়ার জন্য অমর পালকে ফোন করি। উদ্দেশ্য জেনে তিনি সম্মতি দিলেন। প্রায় ২০ মিনিটের একটা টেলিফোন আলোচনা রেকর্ড করি। সে সময় তিনি ছিলেন বেশ আবেগ আক্রান্ত। বাংলাদেশ ও ব্রাাহ্মণবাড়িয়া তার মনে কিভাবে গেঁথে রয়েছে, সেই বর্ণনাই তিনি দিচ্ছিলেন নানাভাবে।

নিজ শহরের (ব্রাহ্মণবাড়িয়া) মাঝখানে লোহারপুলের কাছে ফকিরের কণ্ঠে ‘মুসলমানে বলে আল্লা, হিন্দু বলে হরি’ ফেলে আসা এই গানের মর্মবাণী তার কানে এখনো বাজে। জগৎবাজারে অমর পালদের দোকানের সামনে ফকিরদের গাওয়া পাঁচালী গান এখনো গেয়ে চলেন একটুও না থেমে। বাড়ির আঙিনায় হওয়া গাজির গান, বেদেদের গান, তিতাস পাড়ের স্মৃতি তিনি বুকে এমনভাবে আগলে রেখেছেন আজো তা ম্লান হয়নি। সেদিন তিনি বেশ কয়েকটা গানও শুনিয়েছিলেন। এবিসি রেডিওর শ্রোাতারা বেশ মুগ্ধ হয়েছিলেন তা শুনে।

(খ)
সহধর্মীনি লিজাকে সঙ্গে নিয়ে মাত্র ৩০ মিনিটেই ট্যাক্সি চেপে বিকেলবেলা পূর্ণ দাস রোড হতে এমএন নস্কর রোডে অমর পালের বাড়ি পৌঁছাই। টালিগঞ্জ লাইন হয়ে কিভাবে সেখানে যেতে হবে, সব তিনি ফোনে আগেই বলে দিয়েছিলেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মানুষ পেয়ে তার আনন্দের সীমা রইলো না। খুটিনাটি নানা বিষয়ে জেনে নিচ্ছেন। বয়স ৯৪ পেরিয়ে গেছে। কোমরের হাঁড় ভাঙা। যাওয়া হয় না কোথাও। আমেরিকা-কানাডা কত দেশে যাওয়ার আমন্ত্রণ আসে। কিন্তু কোথাও যেতে পারেন না। অথচ ব্রাহ্মণবাড়িয়া যাওয়ার কী আকুতি তার। বাড়ি থেকে পালিয়ে ট্রেনে করে কিভাবে প্রথম কলকাতা আসার গল্প শুনতে থাকি। নাটকীয়তার শেষ নেই সেই যাত্রায়। পরে গোয়ালন্দেও ট্রেনে প্রতিবেশীর সঙ্গে দেখা হয়ে যাওয়া, ওই যাত্রায় তাকে অভিভাবকের মতো আগলে রাখা- এসব কথা যেন ফুরোতে চায় না। তার প্রকাশিত বইয়েও লিখেছেন কথাগুলো। আমি ওসব পাশ কাটিয়ে আরো অনেক না জানা কথা জানার চেষ্টা করি।

অমর পালের সারা ঘর ভরে আছে বহু পুরস্কারে। রাষ্ট্রীয় সম্মাননারও অভাব নেই। একটা ঘরে রাখার জায়গা নেই বলে সারা বাড়িতেই এখন ছড়িয়ে রেখেছেন সেসব। সারা জীবনে সহস্রাধিক গান তিনি রেকর্ড করেছেন। তার স্মৃতিশক্তি এখনো প্রখর, গানের কথা সহজে ভোলেন না। আমি তাকে গানের প্রথম লাইন বলে শেষ করার আগেই ধরে ফেলেন পুরোটা গান। গাজীর গান, বেদে বেদেনীর গান, বেহুলার ভাসান, তার কণ্ঠে একের পর এক খইয়ের মতো ফুঁটছিল। ‘প্রাণ বন্ধের বাড়িতে ফুলের বাগিচা/ ঝলমল ঝলমল বাতাসে’, ‘দুলাইও দরো করি ধরিও কান্ডার’- প্রাণভরে শুনি নানা ধারার গান। শুনেই আবার প্রশ্ন করি, কবে কোথায় কার কাছে কেমন করে এই গান পাওয়া। আমার এই একটা অভ্যাস। সবাই যখন গান শুনেই মুগ্ধ, আমি তখন জানতে চাই এর পেছনের নানা তথ্য। অমর পাল অবলীলায় বলে যান তাদের বাড়ির আঙ্গিনায় গাইন ও বেদেদের গাওয়া সেইসব গানের কথা। এত বছর পরও এসব তার স্মৃতিতে এতটাই জাগ্রত। আমাকে তা অভিভূত করে।

দেশ বিভাগের আগে তার সব কঠিন দিনের স্মৃতি শুনিয়েছেন। কিভাবে দাঙ্গা উত্তাল দিনগুলোতে স্থানীয় মুসলমানদের সমর্থন পেয়েছেন তাও বলেছেন। সর্বোপরি এখনো তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার স্মৃতিতে হেঁটে বেড়ান। জগৎবাজারে ছিল তাদের দোকান। সেখানে মসজিদের আজানের সুর আজও ভোলেননি তিনি। তিতাস নদীর উপর ঘুরে বেড়ানোর স্মৃতি আজো খুব তাড়িত করে। আমাকে বলেন, ‘তোমার বাড়ি কান্দিপাড়া, আমার বাড়ি মাইজপাড়া’। আমি জানাই, তার চোখে দেখা কোনো কিছুই আর আগের মতো নাই। শহরের মাঝখানের লোহারপুল উঠে গেছে স্বাধীনতার আগেই। এখন সেখানে হয়েছে জোড়া কংক্রীটের ব্রীজ। অনেক দরিদ্র মানুষ এখনো সেখানে জড়ো হয় ভিক্ষে করতে।

তবে সেই মানব সমস্বয়ের গান আর কেউ গায় না। আর তিতাসের শীর্ণ ও ক্ষীণ ধারায় পরিণত হওয়ার করুণ কাহিনি শুনিয়ে তার মনটা আর খারাপ করতে চাইনি। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় তিনি আরো একবার গিয়েছিলেন ১৯৯৮ সালে। ওখানে তাকে সংবর্ধনা দেয়া হয়। অমর পাল শোনান সেদিনের স্মৃতি। কালী বাড়িতে গান চলছিল। তিনি গেয়ে চলেছেন, ভক্তরা বায়না ধরে যাচ্ছেন একের পর এক গানের। দেড় ঘণ্টা পেরিয়ে গেছে, তখন হঠাৎ করেই মঞ্চে উঠলেন এডভোকেট আবদুস সামাদ (কয়েক বছর আগে প্রয়াত হয়েছেন)। অমর পালের হাত ধরে বললেন, ‘দাদা নামেন তো! তোমরা কি দাদারে মাইরা ফালাইবা’। অমর পাল ভুলতে পারেন না। ব্রাহ্মণবড়িয়ার মানুষ ছাড়া এ কথা তাকে কে বলবে? তিনি লিজার সঙ্গেও বেশ কথা বার্তা বললেন, সবই ওই ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রসঙ্গে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া আমরাও বছরে মাত্র দুই-একবার যাই। তার এই ভালোবাসার প্রবল টান আমাদেরকেও খুব আবেগ আপ্লুত করে। আবার এটাও বুঝতে পারি, সেদিন ওভাবে সব ছেড়ে না এলে আজকের অমর পালকে আমরা হয়তো পেতাম না।

তিনি বলতে থাকেন, গুরু আয়েত আলী খানের কথা। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার টাউনহলের কাছে গ্রামোফোনে শচীন কর্তার গান শুনেই একদিন মগ্ন হয়েছিলেন গানে। আরেক শচীন, কবিরাজ শচীন ভট্টাচার্য্য, পরবর্তীতে যার ভরসায় এসেছেন কলকাতা গান শেখার তাড়নায়। তারাই জীবনটাকে এদিকে অনেকটা টেনে এনেছে। মায়ের কথা অনেক বলেছেন। বইয়েও উল্লেখ করেছেন কলকাতা আসার পর মা কিভাবে চিঠির ভেতরে লোকগানের কথা লিখে পাঠাতেন। আমাদের প্রিয় বহু গানের উৎস ও ভ্রমণ বৃত্তান্ত শুনতে থাকি তুমুল আগ্রহে।

(গ)
লোক গানের প্রতি তার আগ্রহটা জন্মসূত্রেই। অন্য গায়করা যেখানে ভিন্ন সামাজিক অবস্থানে থেকে কারো সংগ্রহের ধন হাতিয়ে নিয়ে কিংবা পটভূমি না জেনেই শুধু গান গেয়ে নিছক প্রাপ্তি যোগের দিকে ঝুঁকেছেন, সেখানে অমর পালকে দেখি এই সংস্কৃতির ভেতরেই তিনি বড় হয়েছেন, আপন সংস্কৃতির সক্রিয় বাহক হয়ে। তাই লোক গানের পেছনের গল্পটাও তিনি জানেন। বহু গানের পটভূমি তিনি বলে যেতে থাকেন অবলীলায়। এভানেই দেখি আরো অনেকের সঙ্গে তার আলাদা হয়ে ওঠার দিক।

তিনি আমাকে একটা নাম বারবার বলছিলেন। সাবের চৌধুরী, ঢাকার কবি। তার লেখা ‘আকাশ আমার ঘরের ছাউনী’ গানটি জীবনের গাওয়া একটি শ্রেষ্ঠ গান মনে করেন তিনি। পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন মন্ত্রী সুভাস বাবু তার কাছে এলেই এই গানটির কথা বলতেন। বুদ্ধ বাবু এমনকি, পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জীও অমর পালের এক বড় ভক্ত। শুধু লোক গানের চর্চা করেই মানুষের ভালোবাসা ও জীবনে এত কিছু অর্জন সম্ভব হয়েছে বলে তিনি মনে করেন। গ্রামোফোন কোম্পানির ম্যানেজার বাবুদের প্ররোচনায় অন্য গান গেয়ে বিত্তবান হওয়ার লোভ কখনো তার মাথায় চাপেনি।

দুই ছেলে অমর পালের। স্ত্রী প্রয়াত হয়েছেন বহু আগে। তিনি নরসিংদির রায়পুরা হতে অভিবাসিত হয়ে এসেছিলেন। অমর পালের বড় ছেলেও চাকরি থেকে অবসর নিয়েছেন। ছোট ছেলে কিছুটা মানসিক ভারসাম্যহীনতায় ভোগেন। বড় কষ্ট তাঁর পরিবারের কেউ গান করে না। এ প্রশ্ন তাঁকে শুনতে হয় নানাজনের কাছ থেকে। বড় ছেলে আগে বেতারে গান করতেন। কিন্তু মাতৃবিয়োগের পর আর গান করেন নি। সময় গড়িয়ে যায়। আমরাও উঠে আসি। কত কথা তার, যেন বলা শেষ হয় না। কানে বাজতে থাকে :

ওই দেখ বলাই করে শিঙ্গার ধ্বনি
আমরা যে শুনিরে….

লোকসংগীত গবেষক ও গায়ক
বিভাগীয় প্রধান, নৃবিজ্ঞান, ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ।

Share.

About Author

Leave A Reply