বায়োমেট্রিক্স

0

বায়োমেট্রিক্স কি

কিছুদিন আগেও বাংলাদেশে যে শব্দটি তুমুল আলোচিত ছিলো সেটি- বায়োমেট্রিক্স। বায়োমেট্রিক্সকে বলা যেতে পারে ব্যক্তির শারীরিক কোনো বৈশিষ্ট্য যেমন আঙ্গুলের ছাপ, মুখবয়ব সনাক্তকরণ ও চোখের আইরিশ স্ক্যানিং এর মাধ্যমে ঐ নির্দিষ্ট ব্যক্তিটিকে সনাক্তকরণের একটি প্রযুক্তিগত পদ্ধতি। সে বিবেচনায় সভ্যতার সূচনালগ্ন থেকেই আসলে ‘বেসিক বায়োমেট্রিক্সের’ ব্যবহার হয়ে আসছে। যেমন আপনার ফেইসবুকের প্রোফাইলের ছবি যা দিয়ে আপনার বন্ধুরা আপনাকে চিনে নিতে পারে, কিংবা ক্লাশের জমজ ভাইদের মাঝে কারো গালে কোনো বার্থ মার্ক দিয়ে শিক্ষক চিনে নেন তার প্রিয় ছাত্রটিকে। অথবা আপনি আপনার স্বাক্ষরের মাধ্যমে ব্যাংক থেকে টাকা তুলেন- এসবই বেসিক বায়োমেট্রিক্স। এরকম বেসিক বায়োমেট্রিক্সের প্রধান সমস্যা হলো ব্যক্তির ওই শারীরিক বৈশিষ্ঠগুলোর পরিবর্তনের সাথে সাথে তাকে সনাক্তকরণটাও কঠিন হয়ে পড়ে। তাই বেসিক বায়োমেট্রিক্স নির্ভুলভাবে তথ্য প্রদানে ব্যর্থ হয়। দুই দশকের গবেষণার পরে এই বেসিক বায়োমেট্রিক্স, এডভান্সড বায়োমেট্রিক্সে রুপ নেয়, যার ফলে শতভাগের কাছাকাছি নির্ভুল ও নির্ভরযোগ্যভাবে ব্যক্তিকে সনাক্তকরণ সম্ভব হয়।

আমাদের জিজ্ঞাসা

সম্প্রতি বাংলাদেশে বায়োমেট্রিক্স পদ্ধতিতে সিম নিবন্ধন ইস্যুতে বায়োমেট্রিক্স শব্দটি সামনে আসে। সাধারণত যে জিজ্ঞাসাগুলো বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে সিম নিবন্ধন করার আগে আমাদের ছিলো সেগুলো হলো, ১। যদি ব্যক্তির ব্যক্তিগত তথ্য মোবাইল কোম্পানীর ডাটাবেজে চলে যায়, ২। এমনও দেখা গেছে যে, একই ব্যক্তির ফিঙ্গারপ্রিন্ট ব্যবহার করে অনেকগুলো সিম নিবন্ধন করা। সাধারণ জনগণ অবশ্যি সরকারের কাছে তাদের ব্যক্তিগত তথ্য দিতে অনীহা প্রকাশ করেনি। এমনকি জাতীয় পরিচয়পত্রে সকল নাগরিকগণই তাদের আঙ্গুলের ছাপের মাধ্যমে বায়োমেট্রিকের আওতায় এসেছিলো। তথাপি একটা ভিনদেশি মাল্টিন্যাশানাল কোম্পানীর ডাটাবেজে তাদের আগুলের ছাপ আবার দিতে অনীহা থাকতেই পারে। যুক্তিসঙ্গত বটে।

বাংলাদেশ সরকারের ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয় এই ব্যাপারে আশ্বস্থ করেছে যে, মোবাইল কোম্পানীগুলো কেবল জাতীয় পরিচয়পত্রে দেয়া আমাদের আঙ্গুলের ছাপের সাথে পুনরায় দেয়া আমাদের ছাপ মিলিয়ে নিয়ে সনাক্তকরণ করেছে মাত্র। তবে বেশিরভাগ গ্রাহকেরই হয়তো অজানা যে, বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে ব্যক্তির অরিজিনাল মুখবয়বের ছবি বা ফিঙ্গারপ্রিন্ট বা আইরিশের ছবি ডাটাবেজে সংরক্ষণ করেনা। বরং একটা টেমপ্লেট সংরক্ষণ করে যা আসলে ব্যক্তির ওই অরিজিনাল ছবির একটি ডিজিটাল এনকোডেড রুপ মাত্র। আর যে মেশিনের মাধ্যমে ওই টেমপ্লেটটি তৈরি হয়, সেটিকে এমন জটিলভাবে করা হয় যেন টেমপ্লেট ডাটা ব্যবহার করে পুনরায় অরিজিনাল ছবি তৈরি করা, প্রায় অসম্ভব। আর তাই বায়োমেট্রিক পদ্ধতি নিয়ে ভীতির কিছুই নেই।

কেন প্রয়োজন?

ব্যক্তির সঠিক পরিচয় সনাক্তকরণের প্রয়োজনীয়তা বর্তমান সভ্যতায় অপরিহার্য। বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে ব্যক্তি সনাক্তকরণের মাধ্যমে এখন অবধি যে কাজগুলোর প্রচলন হয়েছে তার ভিতর সীমান্তে অবাধে অসাধু ব্যক্তি বা সন্ত্রাসীর গমন নিয়ন্ত্রণ, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কাজে বিশেষভাবে অবদান রাখছে। পাশাপাশি, প্রতারকচক্র প্রতিরোধসহ সরকারী নানান ক্ষেত্রে কাজে লাগছে। যেমন আপনি আপনার হারানো সিমটি উঠাতে চান। একটা কাস্টোমার কেয়ারে চলে যান। আপনার নম্বরটি বলুন ও আপনার আঙ্গুলের ছাপ দিন। ১০ মিনিটের ভিতরে ফিরে পাবেন আপনার সিমটি। এক্ষেত্রে দলিলিক কাগজপত্রাদির ব্যবহার কমে গেলেও ব্যক্তি নিজেই দলিল হিসেবে স্বাক্ষ্য দিচ্ছে।

বিশ্বজুড়ে সীমান্ত ব্যবহারকারি মানুষের সংখ্যা অবিরাম বৃদ্ধি পাচ্ছে। সেই সাথে বাড়ছে ঝুকি, তাই সামগ্রিকভাবে নিরাপত্তার জন্য সীমান্ত নিয়ন্ত্রণকারী অফিসারদের প্রয়োজন হচ্ছে নির্ভুলভাবে ব্যক্তি সনাক্তকরণের প্রয়োজনীয়তা। এই বিবেচনায় বিশ্বের ৬০ টির বেশি দেশে বায়োমেট্রিক পাসপোর্ট পদ্ধতি সংযোজন করা হয়েছে বা সংযোজনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। উদাহরণ দেয়া যেতে পারে, সিঙ্গাপুরে ২০০৬ সাল থেকে বায়োমেট্রিক পাসপোর্ট সংযোজনের মাধ্যমে তাদের ইমিগ্রেশন প্রক্রিয়ায় সময় ও ভুল উল্লেখযোগ্য হারে কমে এসেছে। হিসেব করলে একজন ব্যক্তির ইমিগ্রেশন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে সময় লাগে ১২ সেকেণ্ড, যেখানে ভুল হবার সম্ভাবনা ০.০০১ পারসেন্ট। ভারতে ২০০৯ সালে ১.২ বিলিয়ন মানুষকে একটি মেগা বায়োমেট্রিক সনাক্তকরণ পদ্ধতির ভিতরে নিয়ে আসে। একটি সিকিউরিটি নম্বর সংযোজনের মাধ্যমে তাদেরকে স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষাসেবা প্রদান করার ব্যবস্থা করা হয়। পাশাপাশি ভোটার রেজিস্ট্রেশনের কাজটাও এর মাধ্যমে সম্পন্ন হয়েছে।

সম্প্রতি বাংলাদেশ সরকার অবৈধ মোবাই ফোন ব্যবহার বন্ধের জন্য বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে (আঙ্গুলের ছাপ) মোবাইল সিম নিবন্ধন প্রক্ররিয়া সশেষ করেছে। বিটিআরসি এর দেয়া তথ্য অনুযায়ী ৩১ মে ২০১৬ রাত ১২ টা পর্যন্ত ১০ কোটি ৮১ লাখ ৮ হাজার ১৩৮ টি সিম এই পদ্ধতিতে নিবন্ধিত হয়েছে। আশার কথা হলো, অসাধু ব্যবসায়ী বা প্রতারকচক্র মারফত একই ব্যক্তির নামে অসংখ্য সিম নিবন্ধনের তথ্য পত্র-পত্রিকায় আসার পর পাওয়ার পর ডাক ও টেলি যোগাযোগ বিভাগ অতিরিক্ত নিবন্ধিত সিম বন্ধের প্রক্রিয়াও শুরু করেছে।

মাল্টি-মোডাল-বায়োমেট্রিক কি

যদিও অতীতের সব সনাক্তকরণ ও প্রমাণীকরণ পদ্ধতির চেয়ে বায়োমেট্রিক ‘সনাক্তকরণ ও প্রমাণীকরণ পদ্ধতি’র যথেষ্ট উন্নতি সাধন করেছে তবুও কোনো প্রযুক্তিই ভুলভ্রান্তির উর্ধ্বে না। হতে পারে ভুলভ্রান্তির সম্ভাবনা খুবই সামান্য। তদুপরি সিঙ্গেল প্যারামিটার যেমন কেবল ফিঙ্গারপ্রিন্ট সব ক্ষেত্রে বায়োমেট্রিক পদ্ধতির জন্য কাজে লাগানো যায় না। যেমন অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় শ্রমিক বা হাতের কাজ করে এমন কর্মীদের ব্যবহার-উপযোগী আঙ্গুলের ছাপ পাওয়া যায় না। আবার কিছু জেনেটিক বৈশিষ্ঠের কারণে আঙ্গুলের ছাপ নাও থাকতে পারে। মুখবয়ব সনাক্তকরণের ক্ষেত্রেও পর্যাপ্ত আলো না থাকলে বা সাংস্কৃতিক নানান আচার যেমন মুখবয়বে নানান রকমের কাপড় পরিধান করা ইত্যাদি কারনেও এই পদ্ধতি সমস্যার মুখে পড়ে থাকে। এসব সমস্যা বিবেচনায় মাল্টি মোডাল বায়োমেট্রিক পদ্ধতি ব্যবহার শুরু হয়েছে যেখানে যেকোন দুইটি প্যারামিটার যেমন ফিঙ্গারপ্রিন্ট ও মুখবয়বের ছবি নিয়ে একে অপরকে সত্যায়িত করার মাধ্যমে সনাক্তকরণ করা হয়।

শেষের কথা

নানা কারণে আমরা এখনো বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে স্বাভাবিকভাবে নিতে পারিনি। সরকারের পক্ষ থেকে বায়োমেট্রিকের বিষয়টির প্রয়োজনীয়তা ও ব্যক্তির নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা রক্ষার বিষয়টি পরিচ্ছন্নভাবে প্রচার করা হলে হয়তো এরকম দ্বিধা তৈরি হতো না। বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে সিম নিবন্ধন না করার পক্ষে বিপক্ষে আমরা তাই হাজারো কথা আলোচনা সমালোচনা করেছি। যুক্তি তর্ক তুলে ধরেছি। আমাদের বিশ্লেষণ জানিয়েছি, সোস্যাল মিডিয়ায় ঢালাও ভাবে প্রকাশ করেছি। প্রকৃতপক্ষে প্রযুক্তি তখনি সুফল বয়ে আনে যখন তার ব্যবহার সঠিকভাবে করা হয়। মানুষের প্রয়োজনের স্বার্থে করা হয়। মানুষের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষার দিকে সচেষ্ট থাকা হয়। তাই যেকোন নতুন প্রযুক্তির সাথে সাধারণ মানুষকে সংশ্লিষ্ট করার ক্ষেত্রে সরকারের নীতি নির্ধারক ও প্রয়োগকারী সংশ্লিষ্টদেরকে আরো বেশি সচেতন হবার আমন্ত্রণ জানিয়ে শেষ করছি আমাদের বায়োমেট্রিক আলোচনা।

Share.

About Author

Leave A Reply