বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস’ ২০১৭

0

আজ এপ্রিল ২, ২০১৭; ১০ম বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস। এই দিবসটির লক্ষ্য হল অটিজম আক্রান্ত শিশুদের ব্যাপারে মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধি করা। এই দিনটিকে কেন্দ্র করে দেশের সরকারী ও বেসরকারী সংগঠনের পাশাপাশি শিক্ষক, স্বাস্থ্যকর্মীরা বিভিন্ন শিক্ষামূলক কার্যক্রম ও অটিজম শিশুদের আঁকা চিত্রকলা প্রদর্শনীর আয়োজন করে থাকে। দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য হলো, “ব্যক্তি স্বাধীনতা ও দৃঢ় সংকল্পের পথে”।

অটিজম একটি মস্তিষ্কের বিকাশজনিত সমস্যা। এতে আক্রান্ত শিশুরা অস্বাভাবিকভাবে আত্মমগ্ন থাকায় ভাষাবিকাশে অদক্ষ হয়। অটিজম শনাক্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দ্রুত একজন অভিজ্ঞ স্পীচ এন্ড ল্যাংগুয়েজ থেরাপিষ্টের শরণাপন্ন হওয়া প্রয়োজন এবং এটা প্রমাণিত যে নিয়মিত থেরাপি সেবার মাধ্যমে এই শিশুদের সুদূরপ্রসারী উন্নতি করা সম্ভব। একজন অভিজ্ঞ স্পীচ এন্ড ল্যাংগুয়েজ থেরাপিষ্ট শিশুর রোগের ধরন ও মাত্রা শনাক্ত করেন এবং শিশুকে সহজভাবে শিখতে, বুঝতে বা মনের ভাব প্রকাশ করতে সহযোগিতা করেন। থেরাপিষ্টের দেখিয়ে দেয়া পদ্ধতিতে অভিভাবক যদি বাসায় নিয়মিত শিশুকে প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকেন তাহলে খুব দ্রুত উন্নতি সম্ভব। এজন্য থেরাপিষ্ট, অভিভাবক, শিক্ষকসহ সমাজের সকল মানুষদের দলবদ্ধ হয়ে কাজ করতে হবে।

একজন অভিভাবকের অংশগ্রহণ এই শিশুদের উন্নতিতে সর্বোচ্চ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। একজন অভিভাবকই একটি স্নেহসুলভ সম্পর্কের মধ্য দিয়ে শিশুর ভাষাবিকাশের সুযোগ ও সুন্দর পরিবেশ তৈরি করতে পারেন। একটি শিশুর ভাষা বিকাশের সফলতা নির্ভর করছে তার অভিভাবকের যথার্থ সহযোগিতার উপর। এ পর্যায়ে অভিভাবকগণ যেভাবে শিশুদের সাহায্য করতে পারেন সে বিষয়ে কিছু দিকনির্দেশনা দেওয়া হল-

  • আপনারা এই শিশুদের সাথে ধীরে ধীরে এবং ছোটো ছোট বাক্যে কথা বলুন। সেইসাথে যে জিনিস নিয়ে কথা বলছেন সেটা তার সামনে (বাস্তব) অথবা ছবি দেখিয়ে শুধু তার নাম বারবার করে বলুন।
  • শিশুকে কথা বলার জন্য অতিরিক্ত চাপ দেওয়া, অধিক প্রশ্ন করা এবং অনেক বেশি কথা একবারে বলা থেকে বিরত থাকুন।
  • শিশুর সাথে কথা বলার সময় এবং খেলার সময় আপনার চোখে চোখ রাখতে উৎসাহিত করুন। সেইসাথে একই উচ্চতায় ও সামনাসামনি বসে কথা বলুন।
  • শিশুকে খেলার সময়, জামা কাপড় পড়ানোর সময়, খাওয়ানোর সময় দুইটি বস্তু সামনে রেখে তাকে পছন্দ করার সুযোগ দিন।
  • শিশুকে খেলার মাধ্যমে অপরের সাথে খেলনা ও জিনিসপত্র দেওয়া-নেওয়া করতে শেখান। যেমন- বল অথবা গাড়ী দেওয়া ও নেওয়া।
  • শিশুকে তার পছন্দের খেলা, ছড়া ও গানের মাধ্যমে কোন কাজে মনোযোগ বৃদ্ধিতে উৎসাহিত করুন।
  • শিশুর প্রিয় বস্তু শিশুর নাগালের বাইরে কিন্তু দৃষ্টি সীমার ভিতরে রেখে ইশারা অথবা কথার মাধ্যমে অনুরোধ করা শেখাবেন।
  • শিশুকে দৈনন্দিন ব্যবহৃত জিনিসপত্রের নাম, শরীরের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গের নাম ও এদের কাজ এবং সেইসাথে বিভিন্ন রঙের সাথে পরিচিত করুন।
  • শিশুকে সামাজিক আচরণ শেখাতে সাহায্য করুন যেমন- হাত মেলানো কিংবা বিদায় নেওয়ার সময় টাটা দেওয়া, সালাম দেওয়া ইত্যাদি।
  • শিশুকে শব্দ বা শারীরিক অঙ্গভঙ্গি অনুকরণ করতে উৎসাহিত করুন। যেমন- হাত তালি, মুখে শব্দ (স্বরবর্ণ- আ, ই; ব্যঞ্জনবর্ণ- মা, বা, দা এবং ধীরে ধীরে শব্দ- আম, আমি, আবার, দাও) করা।
  • একটি বস্তু বিভিন্ন জায়গায় রেখে তার অবস্থানের সাথে পরিচিত করুন। যেমন- উপরে, নিচে, সামনে, পিছনে।
  • আপনি অথবা শিশু যে কাজটি করছেন তা ব্যাখ্যা করুন। যেমন- আমি রান্না করছি, তুমি খেলছ।
  • খেলাধুলার মাধ্যমে কার্যকারণ বুঝাতে উৎসাহিত করুন। যেমন- সুইচ টিপলে লাইট জ্বলে, ঝুনঝুনি নাড়লে শব্দ হয়।
  • শিশুকে বিভিন্ন মৌখিক নির্দেশনা পালনে সহায়তা করুন। যেমন- বল রাখ, গাড়ী আনো।
  • শিশু কোন শব্দ ভুল উচ্চারন করলে, তাকে ‘ভুল হয়েছে’ না বলে আবার বলার জন্য উৎসাহ দিন।
  • শিশু যদি আপনার প্রশ্ন বা কথা পুনরাবৃত্তি করে তাহলে আপনি প্রশ্ন করার সাথে সাথে উত্তরটি কি হবে তাও বলে দিন। যেমন- ‘তোমার নাম কি?’ আমার নাম….। (আপনি নামটি বলে দিন)
  • কোন একটি নির্দিষ্ট ঘটনা, গল্প বা কথোপকথনকে সঠিকভাবে ব্যাখ্যা করে বলুন।
  • কোন একটি সমস্যা কিভাবে সমাধান করবে সে বিষয়ে তাকে সাহায্য করুন। যেমন- দুর্ঘটনা বা আগুন লাগলে কিভাবে সমাধান করবে।

আমাদের সমাজে এই বিশেষ শিশুর জন্য তার অভিভাবককে দায়ী করা হয়। এটি একটি সম্পূর্ণ ভ্রান্ত ধারনা। এবং কোনো একক চিকিৎসা পরিকল্পনা নয় বরং দ্রুত, গঠনগত ও স্বতন্ত্র সেবাই হতে পারে উপযুক্ত মাধ্যম। শিশুর ভাষা বিকাশের উন্নতি সাধনের পরিকল্পনা সম্পূর্ণরুপে বাস্তবায়নের ব্যাপারে স্পীচ এন্ড ল্যাংগুয়েজ থেরাপিষ্ট অভিভাবকদের সহযোগিতা করে থাকেন। এক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরণের সম্মিলিত কৌশল প্রয়োগ করা হয়, যা ভাষা বিকাশে দারুণ ফলপ্রসূ ভূমিকা রাখে। মোটকথা, পরিবার ও সমাজের সব স্তরের মানুষের সচেতনতায় অটিজম আক্রান্ত শিশুদের প্রতি সুদৃষ্টির মাধ্যমে একটি অটিজমমুক্ত বিশ্ব গড়ে তুলা সম্ভব। “একতাই শক্তি” আর এই শক্তি বলেই আমরা আমাদের বিশেষ শিশুদের উপহার দিতে পাড়ি একটি সুনিশ্চিত সুন্দর পৃথিবী।

হিমিকা আরজুমান, কনসালটেন্ট স্পিচ এন্ড ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপিস্ট
ব্যাবস্থাপনা পরিচালক, থেরাপি প্লাস
(একটি থেরাপি এবং পুনর্বাসনভিত্তিক চিকিৎসাসেবা প্রতিষ্ঠান)

যোগাযোগঃ ০১৭৫৯ ১৯ ৫৬ ২২

Share.

About Author

Leave A Reply