ব্রেক্সিট এবং ইউরোপের ভবিষ্যৎ

0

ইউরোপীয়ান ইউনিয়ন (ইইউ) এর সঙ্গে বৃটেনের সম্ভাব্য সবধরনের লাভজনক কার্যক্রমে অংশ গ্রহন ‍ছিল।বৃটেন যদিও ইইউ এর একক মুদ্রা ইউরো গ্রহণ করেনি তবুও তারা ইইউ এর একক মার্কেটের অংশীদার ছিল। এবং দেশটি ইইউ এর নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিভিন্ন আইনের দ্বারা একটি ভাল নিরাপত্তা বেষ্টনির বলয়ে ছিল। এত সব সুবিধা পওয়ার পর ও যুক্তরায্য ইইউ থেকে লীভ করার বা বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু কেন?

এর উত্তর পওয়া যেতে পারে মাস ব্যাপি আলোচিত মতামতের ভোট বা গণভোটের রায় থেকে যাকে বলা হচ্ছে ব্রেক্সিট। ব্রেক্সিট বিতর্ক ‍এমন সময় শুরু হয় যখন সমগ্র ইউরোপজুড়ে শরনার্থী সমস্য প্রকট। ইইউ সদস্য দেশ গুলোতে দ্রুত শরনার্থী সংখ্যা বৃদ্ধি এবং ফ্রন্সের কায়লাস বন্দর হয়ে বিপুল সংখ্যক শরনার্থীর যুক্তরায্যে প্রবেশের চেষ্টা লীভ গ্রুপ এর মনোযোগ আকর্ষন করে। নিয়ন্ত্রণহীণভাবে শরনার্থীরা ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে যে কোন ভাবে যুক্তরাজ্যে প্রবেশ করছিল যা গণভোটের বিতর্কে বারুদের মত কাজ করে। যুক্তরাজ্যের ব্রেক্সিট বির্তক চলাকালীন সময়ে পুরো ইউরোপজুড়ে শরনার্থীর সমস্যায় পরিস্থিতি ভয়ানক অবনতি হলেও ইইউ শরনার্থী সমস্যার সমাধানে যথাযথ নীতি প্রনয়ণে বিলম্ব করে; উদাহরণস্বরুপ বলা যায় কায়লাস বন্দরে শরনার্থীদের উপছে পড়া ভিড় ও ‍বিশৃংখল দৃশ্য।

জার্মান চ্যান্সেলর এঞ্জেলা মর্কেল শরনার্থীদের জন্য তার দেশের দরজা খুলে দেন যা ‍ছিল উৎসাহব্যঞ্জক কিন্তু এতে পুরো শরনার্থী সমস্যাকে অবজ্ঞা করা হয় এবং তা যথাযথভাবে চিন্তা করা হয় নি। এর ফলে ইইউ এর সদস্য দেশগুলোতে আশ্রয় প্রার্থী শরনার্থীদের আন্ত:প্রবাহ বৃদ্ধি পায় যা সমগ্র ইইউ তে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে বিঘ্নিত করে। ইইউ শরনার্থী সমস্যার সমাধানে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ না করায় স্থানীয় জনগণ, পাবলিক নিরাপত্তারক্ষায় নিয়োজিত কর্তৃপক্ষ এবং শরনার্থীরা নিজেরাও তীব্র সমস্যায় জর্জরিত হয়। ফলশ্রুতিতে স্থানীয়দের মধ্যে শরনার্থী সমস্যা উদ্বেগের কারন হয়ে দাঁড়ায় যা পরবর্তীতে ইইউ ভুক্ত সদস্য দেশসমূহে ইইউ বিরোধী ‍বিভিন্ন রাজনৈতিক দলসমূহ সৃষ্টিতে উৎসাহ যোগায়। উদাহরণস্বরুপ যুক্তরাজ্যের ‘ইন্ডিপেন্ডেন্ট পার্টির’ কথা বলা যায়। এই দলটি যুক্তরাজ্যের গণভোটের ব্রেক্সিটের পক্ষে নেতৃত্ব দেয়। গত ২৩ জুন ১৬, বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত গণভোটে যুক্তরাজ্যের জনগণ ব্রেক্সিটের পক্ষে এক ঐতিহাসিক রায় দেয়। এখন আগামী দুই বছরের মধ্যে যুক্তরাজ্য ইইউ থেকে বের হয়ে যাবে।

তাই ইইউতে বর্তমানে একটি ‍বিপর্যমূলক দৃশ্য উম্মোচিত হয়েছে এবং ইইউ অভাবনীয় বিভাজনের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। এখন যুক্তরাজ্যের ইইউ ত্যাগ তুলনামুলকভাবে ভালও হতে পারে আবার নাও হতে পারে কিন্তু দেশটির জনগণ ও অর্থনীতি স্বল্প ও মধ্য মেয়াদী সংকটে পড়বে। ব্রেক্সিটের ফলাফল প্রকাশিত হওয়ার পরবর্তী মুহূর্তেই যক্তরাজ্যের মুদ্রা পাউন্ড স্টারলিং এর মান গত ‍তিন দশকের সর্ব নিম্ন হয় এবং বিশ্বব্যাপি আর্থিক বাজার সমূহে দরপতন হয়। বৃটেনের ইইউ থেকে বের হওয়ার জন্য অনেক জটিল রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিচ্ছিন্নতার প্রক্রিয়াগুলোর মুখোমুখি হবে। ফলে বৃটেনের অর্থনীত ২০০৭-২০০৮ এর মত সংকটে পড়বে।

যুক্তরাজ্য ইইউ জোট ত্যাগ করলে তা এই জোটে অনিশ্চয়তা এবং ঝুঁকির সৃষ্টি করবে। ব্রেক্সিট জয় লাভ করার কারণে তা ইইউ এর সদস্য দেশসমূহের ইইউ বিরোধী শক্তিসমূহকে উৎসাহিত করবে। ব্রেক্সিটের ফলাফল প্রকাশের পরমূহর্তে ফ্রান্সের জাতীয়তাবাদীরা ফ্রেক্সিট এর ঘোষনা দেয় অন্যদিকে ডাচের জাতীয়তাবাদীরা নেক্সিট আয়োজনের ঘোষনা দেয়।

ব্রেক্সিটের প্রতি ইইউ কিভাবে সাড়া দেয় তার উপর ইইউ এর ভবিষৎ নির্ভর করবে। ইইউ এর নেতৃবিন্দু ইইউ ত্যাগকে ঘৃণার দৃষ্টিতে দেখছেন। তারা ব্রেক্সিট পরবর্তী যুক্তরাজ্যকে ইইউ এর ‘একক মার্কেট’ এ প্রবেশ করার অনুমতি নাও দিতে পারে; এটিই হযত তাদের ব্যাথাকে কিছুটা লাগব করবে। কিন্তু এই সিদ্বান্ত বাস্তবায়ন করা কঠিন হবে।

ইইউ এর সদস্য দেশসমূহের আন্ত: সম্পর্ক বর্তমানে তলানিতে পৌঁছেছে শুধুমাত্র শরনার্থী সমস্যাকে কেন্দ্র করেই নয় বরং ইউরোজোনের ঋণদাতা ও গ্রহীতা দেশসমূহের ব্যতিক্রমী পদ্ধতি নিয়েও! তাছাড়া বর্তমানে ফ্রন্স এবং জার্মানী তাদের অভ্যন্তণ সমস্যা নিয়ে ব্যস্ত। ইতালির স্টক মার্কেটে ১০% ধস ও ব্যাংকিং ব্যাবস্থার সংকট সেখানে ব্রেক্সিট এর পথকে অনুসরণ করতে উৎসাহিত করবে। ইতালির ইইউ ‍বিরোধীদের দল ‘Five Star Movement’ ক্রমান্বয়ে জনপ্রিয়তা পাচ্ছে এবং রোমের মেয়র পদে বর্তমানে এই দলটিই আছে। এভাবে ইতালির পরবর্তী বছরের সধারণ নির্বাচনে এই দলটির ক্ষমতায় আসার সম্বাভাবনা বেশি।

ইইউ এর কোন সদস্য দেশই এটির প্রয়োজনীয় সংস্কারের ‍বিষয়ে উৎসাহিত নয়। বর্তমানে যেসব জায়গাগুলোতে গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার আনা প্রয়োজন সেগুলো হচ্ছে Genuine Financial Union, Controlled Fiscal Union এবং গণতাণিএক জবাবদিহিতা বৃদ্ধির জন্য অধিক গুরত্বপূর্ণ কৌশল প্রণয়ন করা। অন্যদিকে ইইউ তুরস্ক ও রাশিয়া থেকে বাহ্যিক চাপে আছে। তুরস্ক ও রাশিয়া উদ্দেশ্য হচ্ছে ইইউ এর অভ্যন্তরে রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি করে সুবিধা আদায় করে নেওয়া।

অনুবাদ: মানছুর হোসেন, প্রজেক্ট সিন্ডিকেট থেকে নেওয়া।

জর্জ সরস, চেয়ারম্যান, সরস ফাউন্ডেসন।

Share.

About Author

Leave A Reply