ব্রেক্সিট, গ্লোবালইজেশনের জন্য হুমকি !!!

0

ব্রেক্সিট বিশ্বব্যাপি ইকুইটি এবং আর্থিক বাজারে প্রবল ঝাঁকুনি দিয়েছে। পূর্ব থেকে চলমান অতি সংবেদনশীল আর্থিক বাজারের টালমাটাল অবস্থার মধ্যেই ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন (ইইউ) বিরোধী ‘লীভ’ সমর্থনকারী ভোটারদের জয় ‍বিশ্বব্যাপি বিনিয়োগের নিরাপদ স্বর্গগুলোতেও বিনিয়োগকারীদেরকে ভীতিকর বার্তা দেয়। ব্রেক্সিট পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্টের ট্রেজারি বন্ড এর মান বৃদ্ধি পায়, যুক্তরাজ্যের মুদ্রা ফাউন্ড স্টারলিং এর বিপরীতে বৈশিষ্ট্যমন্ডত ভাবে ডলার, সুইস ফ্রাঙ্ক, জাপানি ইয়েন এর অতিমূল্যায়ন ( একটি দেশের মুদ্রার মূল্য যখন অন্য দেশের মুদ্রার মূল্য অপেক্ষা বৃদ্ধি পায়) হয়। যুক্তরাজ্যের গণভোটে যখন ‘রিমেইন’ এর পক্ষের দলের পরাজয় নিশ্চিত হয়, তখন ফাউন্ডের মানের অবমূল্যান ( একটি দেশের মুদ্রার মূল্য যখন অন্য দেশের মুদ্রার মূল্যের তুলনায় কমে যায়) হতে থাকে যা এর পূর্বে ১৯৬৭ সালে সর্বনিম্ন ১৪% হয়েছিল। আমরা বিশ্বব্যাপি পুঁজি বাজারে যে পরিবর্তনশীল ফলাফলসমূহ দেখতে পাচ্ছি তা বেক্সিটের প্রভার থেকে অনন্য নয়।
বেক্সিট এর কারণে যুক্তরাজ্য যেভাবে ইইউ ত্যাগ করবে একইভাবে যুক্তরাজ্যকেও বিশ্বের অন্যান্য দেশ এবং যুক্তরাজ্যের নিজের কয়েকটি প্রদেশের সাথে সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চুক্তিসমূহ বর্জন করতে হবে। উদাহরণস্বরুপ বলা যায় স্কটল্যান্ড ও উত্তর আয়ারল্যান্ড যুক্তরাজ্যের দুটি প্রদেশ সেখানকার অধিকাংশ মানুষ ইইউতে ‘রিমেইন’ এর পক্ষে মতামত দেয় এবং প্রদেশ দুটির নেতারা ইইউতে থাকতে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। এই ক্ষেত্রে যদি ইউরোপের কয়েকটি দেশের অসন্তুষ্ট রাজ্যসমূহ তাদের অভ্যন্তরীন জাতীয়তাবাদীদেরকে উদ্বুদ্ধ করে এবং বহু দশকের পরীক্ষীত ইউরোপীয়ান একীকরণ নীতি ত্যাগ করতে চায়, তবে ইউরোপের ‍বিভিন্ন দেশের কিছু রাজ্যের নতুন সীমানা নির্ধারণ অথবা সীমান্তে বেঁড়া দেওয়ার ও প্রয়োজন হতে পারে। যেমন স্পেনের কাতালনিয়া প্রদেশ, যুক্তরাজ্যের স্কটল্যান্ড ও উত্তর আয়ারল্যান্ড এই ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য। এই প্রদেশসমূহ নিজ নিজ দেশ থেকে স্বাধীনতা চায় এবং বেক্সিট পরবর্তী তা আরও জোরদার হবে। এই ধরনের জাতীয়তাবাদ প্রসারিত হয়ে বর্তমানে ইউরোপের বাইরে যুক্তরাষ্টের প্রেসিডেন্ট প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রচারণায় ও দেখা যায়।
ব্রেক্সিট ‍বিশ্বায়নের জন্য একটি বড় ধরনের পশ্চাৎপদতা ‍হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। ব্রেক্সিটের নিয়মতাণিএক ঋণাত্নক প্রভাবসমুহ আর্থিক ক্ষেত্রে, বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে, শ্রমের অবাধ চলাচলের উপর মারাত্নকভাবে প্রয়োগ হবে।
রাজনৈতিক ভূমিকম্প বলতে যা বুঝায় তা সম্ভবত বেক্সিটের চেয়ে বড় আর কিছু হতে পারে না। এখন প্রশ্ন হচ্ছে যুক্তরাজ্যর পৃথক হওয়ার ইচ্ছা ইইউ, ন্যাটো ও আন্তর্জাতিক অর্থনীতিকে কতটুকু টেনে নিচে নামায়। ২০০৮ সালের দুনিয়াজুড়া অর্থনৈতিক মন্দা এবং ১৯৯৭ ও ১৯৯৮ এশিয়ার আর্থিক বাজারের বিপর্যয়ের মত ব্রেক্সিট থেকে সৃষ্ট বিপর্য সম্ভবত ‍বিশ্বব্যাপি খুব দ্রুত সরাসরি আর্থিক খাতে সংকট সৃষ্টি করবে না।
যুক্তরাজ্যর বাণিজ্য, আর্থিক ও অভিবাসি সংক্রান্ত চুক্তিসমূহ এখন খুব জটিল হয়ে উঠছে এবং এসব চুক্তিকে শীঘ্রই পুন:মূল্যায়ন করার প্রয়োজন হবে। এরই মধ্যে যুক্তরাজ্যের সাথে বিভিন্ন দেশের দ্রব্য, সেবা ও আর্থিক সম্পদের বিনিময় সংক্রান্ত কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে। যদিও ইউরোপে আর কোন দেশ ইইউ ত্যাগ করছে না তবুও বর্তমানে বিশ্ব পুঁজিবাজারে একটি অশনি সংকেত ‍বিরাজমান।
এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে বিশ্বায়ন বা গ্লোবালাইজেশন এই প্রজম্মে সৃষ্টি হয়নি। ঊনবিংশ শতাব্দিতে প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধত সত্বেও আর্ন্তজাতিক বাণিজ্যের ক্রমবর্ধমান সমৃদ্ধি হয়েছিল। ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যের মধ্যে সংঘঠিত ‘শতবছর ব্যাপি’ যুদ্ধে যুক্তরাজ্যের জয়ের পর থেকেই লন্ডন ছিল আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়ন্ত্রণকর্তা। কিন্তু বিশ্বায়নের এই ঢেউ প্রথম বিশ্বযদ্ধে শেষ হয়ে যায় এবং পরবর্তীতে তা আর পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
১৯২০ এর দশকে যুক্তরাজ্যের অর্থনেতিক মন্দা অবস্থা ও ১৯৩০ এর দশকের যুক্তরারষ্ট্রেরসহ সমগ্র বিশ্বে যে অর্থনেতিক মহামন্দার সম্মুখীন হয় এর উল্লেখযোগ্য কারণসমূহ ‍ছিল অতিরিক্ত সংরক্ষনশীলতার নীতি, আন্ত:মুখী উৎপাদন নীতি এবং প্রতিযোগিতামূলক অবমূল্যয়নের ‘ভিক্ষুক-তোমার-প্রতিবেশি নীতি’। বিশ্বায়নের কপিনে শেষ পেরেক ঠুকে দেওয়া হয় যখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বাণিজ্য ক্ষেত্র প্রথম আন্তর্জাতিক সমন্বয় শুরু হয় এবং ১৯৮০ এর দশকে আর্থিক খাতে ও সমন্বয় হয়। এই সময় লন্ডনের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো ঘুমন্ত অবস্থা থেকে আবার জেগে ওঠে এবং সমন্বিত আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক অর্থনীতিতে যুক্তরাজ্যকে একটি ফিলারে পরিণত করে।
২০০৮-২০০৯ সালের পশ্চিমা দেশগুলোর আর্থিক সংকটের পূর্বে বিশ্ববাণিজ্য ও আর্থিক সূচকসমূহ নতুন উচ্চতায় পৌঁছে ছিল যাতে ঐক্যবদ্ধ ইউরোপের অবদান ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। ১৯৩০ সালের মহামন্দার পর থেকে বিশ্ব বাণিজ্যের ধারাবাহিক পতনের ফলশ্রুতিতে বিশ্বব্যাপি আর্থিক সংকট ঘনীভূত হয়। অন্যদিকে ২০০৮ সালের আর্থিক সংকটের পর থেকে এখন পর্যন্ত বিশ্ব বাণিজ্য এর পূর্ব ধারায় পৌঁছাতে পারেনি। এই সময়ের মধ্যে বিশ্ব বাণিজ্যে রপ্তানি সূচকের উন্নয়ন হয়েছে আর্থিক সংকট সৃষ্টির পূর্বের বাৎসরিক গড়ের প্রায় অর্ধেকের ( ৩.১% চিত্র দেখানো হয়েছে যা পূর্ববর্তী বছরগুলোতে ছিল ৬.১%) সমপরিমাণ।

world economics outlook

বিশ্বব্যাপি বিভিন্ন সময়ে সৃষ্ট আর্থিক সংকটসমুহ দ্বারা বিশ্ববাণিজ্য ও আর্থিক খাতে যে বিপর্যয়গুলো দেখা দিয়েছেল তার প্রায় সবগুলোই ‍ছিল বিশ্বায়নের প্রতি তৎপর্যপূর্ণ আঘাত। বর্তমানে শ্রমের অবাধ চলাচলের বন্ধের মাধ্যমে ব্রেক্সিট আবার ‍বিশ্বায়নকে মারাত্নকভাবে আঘাত করেছে।
আর্থিক বাজার সমূহ বিনিয়োগের ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা দূর করতে পারবে না। বিশ্বে ইতোমধ্যে নিম্ন প্রবৃদ্ধি, নিম্ন বিনেয়োগের হার বিরাজমান যার ফলে বেকারত্বের হার ও বৃদ্ধি পাচ্ছে।
বর্তমানে যুক্তরাজ্যের ব্রেক্সিট নামক নতুন খেলা এবং যুক্তরাজ্যের সাথে ইইউ এর ভবিষ্যৎ সম্পর্ক কেমন হবে তার দ্রুত সমাধানের জন্য পর্যাপ্ত ক্ষতি-নিয়ণএণ পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে। যেকোন ধরনের ‍বিলম্ব বিশ্বায়নের ক্ষেত্রে আরও হতাশার সৃষ্টি করবে এবং যুক্তরাজ্যের সাথে ইইউ সদস্য দেশগুলোর নোংরা প্রতিশোধমূলক সম্পর্ক বৃদ্ধি পাবে।
লেখক: প্রফেসর কারমেন রেইনহার্ট
আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যাবস্থা
কেনেডি স্কুল অব গর্ভমেন্ট
হাভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়।
অনুবাদক:
মো: মানছুর হোসেন খাঁ
বিএসএস, এমএসএস, অর্থনীতি বিভাগ
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।
( প্রজেক্ট সিন্ডিকেট থেকে নেওয়া হয়েছে)

Share.

About Author

Leave A Reply